মালয়েশিয়ায় রোড় ট্রিপ ২০২০ঃ পর্ব ১ ক্যামেরুন হাইল্যান্ড

সাধারণত আমার সাথে কেউ রোড় ট্রিপে যেতে চায় না। কারন আমি খুব প্ল্যান করে চলি না। হুটহাট ঠিক করি। যতটা সম্ভব ঘুরতে থাকি, আযথা হোটেলে সময় কাটাই না। আর রাস্তায় যা পাই তাই খেতে চাই। এতটা পাগলামি কেউ সহ্য করার কথা না। তবে খুশীর কথা হচ্ছে আফরিন ও সিনান করে। শুধু সহ্য করে যে তা না, পছন্দও করে।

২০২০ সালের বেশিরভাগ সময়ই কাটলো লকডাউনে। এখানকার লক ডাউন বেশ কঠোর। ফাঁক ফোকর গলে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব না। ডিসেম্বরের আগে আগে লক ডাউন একটু শিথিল করে দিলো। আমিও সেই চান্সে রোড ট্রিপে বের হয়ে গেলাম।

প্ল্যান অনুযায়ী আমরা প্রথমে যাবো ক্যামেরুন হাইল্যান্ড। সেখানে দুই রাত থাকবো। এর পরে  লাংকাউই আইল্যান্ড। সেখানে থাকবো তিন দিন। এর পর যাবো কোটা বাহ্রু। সেখানে দুই দিন। এর পর যাবো কুয়ান্তান। সেখানে আরো দুই দিন। এর পরে বাসায়। আরো লম্বা করার প্ল্যান ছিলো, কিন্তু ১০ দিনের বেশি ম্যানেজ করতে পারছিলাম না। না হলে কুয়ান্তান থেকে জহর বাহ্রু হয়ে মেলাক্কা হয়ে ফিরতাম। তাতে আরো ৬/৭ দিন বেশী লাগতো।

যাবার কয়েকদিন আগে তারেক ভাই ও পরিবার আমাদের সাথে জয়েন করে শুধু ক্যামেরুন পর্যন্ত থাকবেন বলে কনফার্ম করলেন। আমরা সেই মোতাবেক ক্যামেরুন হাইল্যান্ডে একটা তিন রুমের ফ্ল্যাট নিয়ে নিলাম। ক্যামেরুন সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ৬০০০ ফিট উপরে একটি সুন্দর পাহাড়ি এলাকা। বেশ কয়েকটা চা বাগান সহ, স্ট্রবেরী বাগান, আর প্রচুর সবজি বাগান আছে। আবহাওয়া সব সময় ১৭/১৮ ডিগ্রী থাকে। ঘোরার জন্য বেশ চমৎকার একটা জায়গা।

কিন্তু যাবার রাস্তা নিয়ে আমাদের দুই জনের দুই মতামত। আমি চাইলাম বেনতং এর বিখ্যাত লেমাং খেয়ে পুরো পাহাড়ি রাস্তা ধরে ক্যামেরুন যাবো। তারেক ভাই এই রিক্স নিতে পারলেন না। উনি হাইওয়ে ধরে ক্যামেরুন চলে গেলেন।

আমরা বেনতং ঘুরে, বিখ্যাত লেমাং তকি  তে লেমাং, চিকেন বার বি কিউ, চিকেন রেন্দাং, বিফ রেন্দাং খেয়ে ক্যামেরুনের দিকে রওনা দিলাম।

ক্যামেরুন উঠার পথে ভারত ট্রি প্ল্যান্টেশনের একটা রেষ্টুরেন্ট আছে। সেখান থেকে চা বাগানের একটা সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়। তারেক ভাই আমাদের আগেই আপার্ট্মেন্টে পৌছে গেসেন। আমরা অনুরোধ করলাম সেই রেষ্টুরেন্ট এ আসার জন্য। ওনারা চলে এলেন। হোটেল থেকে খুব দূরে না। সবাই আসার পর চা অর্ডার করলাম। সাথে বাচ্চাদের জন্য স্ন্যাক্স। চা খেয়ে ছবি তুলে কিছুক্ষন গল্প করে হোটেলে ফিরে এলাম।

হোটেলে আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। তাই একটু পরেই ডিনার খোজার জন্য বের হলাম। আমরা যে এলাকায় ছিলাম তার নাম তানাহ রাতা। এই এলাকায় আরো অনেকবার এসেছি, তাই চারপাশ চেনা। আমাদের হোটেল একটা ছোট টিলার উপরে। টিলা থেকে নেমে এলেই খাবারের বেশ কয়েকটি দোকান। এর মধ্যে একটি দোকানে ইন্ডিয়ান খাবার পাওয়া যায়। সবাই যেহেতু ইন্ডিয়ান খাবার খেতে পারবে, তাই আমরা সেই হোটেলেই গেলাম।  যাবার সময় চেক করলাম কয়েকটা টূর অর্গানাইজারের সাথে। এখন তাদের সব টূরই বন্ধ। করোনার জন্য কোন টূর আর চালু হয়নি। যাইহোক ভরপেট ডিনার খেয়ে আমরা হোটেলে চলে আসলাম।

পরের দিন কি করবো তার প্ল্যান করতে গিয়ে দেখলাম, পরের দিন সকালে আমাদের সবারই একটা করে মিটিং আছে এবং দুপুরের আগে কেউ ফ্রি নাই। তাই পরের দিন দুপুরের দিকে আমরা চলে গেলাম বোহ ট্রি প্লানটেশনের রেষ্টুরেন্ট । এই রেষ্টুরেন্ট ক্যামেরুনের সবচেয়ে পপুলার টুরিস্ট ডেসটিনেশন। সবাই একবার করে এখানে আসে আর রেষ্টুরেন্ট এ কিছুক্ষন সময় কাটায়। রেষ্টুরেন্ট থেকে চারপাশের চমৎকার ভিউ পাওয়া যায়।

প্রায় ঘন্টাখানেক থেকে চা নাস্তা খেয়ে, সুভেনির দোকান থেকে চা কিনে আমরা পাহাড়ি রাস্তা ধরে চলে আসতে লাগলাম। আসার রাস্তায় একটা স্ট্রবেরী ফার্মে থামলাম। এখানকার স্ট্রবেরী ফার্মে নিদির্স্ট পরিমান টাকা দিয়ে আপনি ঝুরি ভর্তি করে স্ট্রবেরী নিতে পারবেন। আমরাও গাছ থেকে পেড়ে দুই বক্স স্ট্রবেরী নিলাম।

এরপর আমরা গেলাম নাইট মার্কেট দেখতে। মালয়েশিয়ার আর বাকি সব নাইট মার্কেটের মত এই নাইট মার্কেটও খাবারের দোকানে ভর্তি। আমি যেহেতু স্ট্রীট ফুড পছন্দ করি তাই কিনে কিনে খেতে লাগলাম। করোনার জন্য ভিড় এড়িয়ে তাড়াতাড়ি বের হয়ে এলাম।

কিন্তু হোটেলে না ফিরে একবারে ডিনার করে হোটেলে ফিরতে চাইলাম। ক্যামেরুনের অন্যতম বিখ্যাত খাবার হচ্ছে স্টীমবোট। স্টীমবোট হচ্ছে টেবিলের উপর পোর্টেবল চুলার উপর সুপ ফুটতে থাকবে। আর তাতে মেরিনেট করা মাংস, মাছ বা সবজি সিদ্ধ করে খেতে পারবেন। কেউ কেউ আবার সুপের পটের পাশে বার বি কিউ করার ছোট জায়গা দেয়, যাতে সিদ্ধের পাশাপাশি বার বি কিউ করেও খাওয়া যায়।

অনেকবার ক্যামেরুন এলেও এটা কখনো ট্রাই করিনি। তাই এবার এটা ট্রাই করার ইচ্ছা ছিলো। তারেক ভাইকে বললাম। উনিও রাজি। তাই নাইট মার্কেট থেকে বের হয়ে কাছেই একটা স্টীমবোট রেষ্টুরেন্ট ঢুকে গেলাম। এই রেষ্টুরেন্টে বুফে অফার চলছিলো। একটা স্টীমবোট নিয়ে যত ইচ্চা তত খাবার খাওয়া যাবে। খাবারের মধ্যে সব ধরনের মাংস, মাছ আর সবজি ছিলো। আবার পটের পাশে বার বি কিউ করারও ব্যবস্থা ছিলো। সাথে আইস্ক্রিম ও ড্রিংক্স ফ্রি ছিলো।

আমরা স্টীমবোট বুফেতে ডিনার শেষ করে হোটেলে ফিরে এলাম। পরদিন সকালে আমাদের বের হতে হবে। কারন দুপুরের মধ্যে কুয়ালা পেরলিস এর জেটিতে গাড়ি রেখে আমাদের ফেরি করে লাংকাউই যেতে হবে। অনেকটা পথ আর এই পথে এই প্রথম। তাই সময় নিয়ে যেতে হবে। হোটেলে ফিরে ফ্রেস হয়ে কিছুক্ষন আড্ডাবাজি করে ঘুম দিলাম।